নেপালের ভয়াবহ বন্যায় একটি পুরো জেলা দেশের অন্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নিজের শৈশবের গ্রাম সোল বাজার ও আশপাশের জনপদকে বন্যার পানিতে নিশ্চিহ্ন হতে দেখেছেন এক সাংবাদিক। ফোনে আসা ভিডিও, স্বজনদের আর্তনাদ আর একের পর এক বিচ্ছিন্ন ফোনকলের মধ্য দিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন সেই ধ্বংসযজ্ঞ। বুধবার ২৬ আগস্ট সকালে কাঠমান্ডুতে অফিসে যাওয়ার পথে স্ত্রী ফোন করে জানান যে, ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে এবং সোল বাজার ও বেত্রাবতীতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। মানুষ আতঙ্কে রাস্তায় ছোটাছুটি করছে।
প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে না পারলেও খবরের ওয়েবসাইট দেখে সাংবাদিকের বুক কেঁপে ওঠে। তিনি বন্ধু ও সাংবাদিক নিরঞ্জনকে ফোন করলে নিরঞ্জন জানান যে তার পরিবার সোল বাজারে আটকা পড়েছে এবং কারো সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। পরবর্তীতে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, গ্রামটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সোল ও টুপছে নদীর তলদেশ থেকে প্রায় ১০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত হওয়ার কারণে ৪৪ বছরেও সেখানে বন্যার পানি পৌঁছায়নি, এমনকি গ্রামের প্রবীণরাও এমন অভিজ্ঞতার কথা শোনেননি।
বন্যার ভয়াবহতায় ওই সাংবাদিকের বড় খালা, খালাতো ভাই মধু দাই ও তাঁর স্ত্রী, অন্য এক খালা, খালার নাতি সিজান ও তাঁর স্ত্রী এবং সিজানের সন্তানরা নিখোঁজ বা মৃত বলে জানা গেছে। এছাড়া তাঁর মামা গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি। স্থানীয় ওয়ার্ড চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপাল জানিয়েছেন, গ্রামে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বেত্রাবতীর প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়ি ভেসে গেছে এবং একটি স্কুল ভ্যানও তলিয়ে গেছে। আহতদের মধ্যে অনেকের হাড় ভাঙা ও চোখের গুরুতর আঘাতের খবর পাওয়া গেছে। নিরঞ্জনের চাচা ফোন করে জানান যে, তার পরিবারের সবাই—বাবা, মা, চাচা, চাচি ও ছোট বোন হিমানি—পানিতে ভেসে গেছেন।
বেত্রাবতী এলাকাটি কেবল একটি বাজার ছিল না, এটি ছিল রাম ও কৃষ্ণের মন্দির এবং ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের কেন্দ্র। কিন্তু এখন সেখানে সবকিছু ধ্বংসস্তূপ। বন্যা ঘরবাড়ির পাশাপাশি রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো জেলা অন্ধকারে নিমজ্জিত। এছাড়া ভাইনসে সেতুসহ নদীর ওপরের প্রায় সব ঝুলন্ত সেতু ভেসে যাওয়ায় জেলা সদর বিদুরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ভৈরামকোট, সামারি, টক্সার, দেউরালি, কিসপাং, কাউলে, ভালছে, সালমে এবং ধাদিংয়ের থারপুসহ বহু এলাকায় পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জেলা হাসপাতালও এখন অনেকের নাগালের বাইরে। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার অভাবে বাড়িতেই মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছেন। স্থানীয়রা লবণ পর্যন্ত কিনতে পারছেন না এবং অনেকে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। এখন পর্যন্ত নেপাল-তিব্বত সীমান্তে এই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৩৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে এবং অন্তত ১ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত নতুন করে বেশ কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রামগুলো আগের অবস্থায় ফিরবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় প্রবীণরা চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।





