দুই বছর আগেও মো. মিজানুর রহমান ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতেন। ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএসে একজন প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। মাসে তাঁর বেতন ছিল ২৪ হাজার টাকা, আর ওই প্রকৌশলী তাঁর অফিসের কিছু কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে মাসে আরও ৫-৬ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতেন। মাস শেষে আয় ছিল ৩০-৩২ হাজার টাকা। গাড়িচালক মিজানুর ডিওএইচএসে কয়েকজন মিলে একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকতেন। অথচ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ৪২ বছর বয়সী এই মানুষটির জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। ৫ আগস্ট মিরপুর মডেল থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে তিনি এখন দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে পরনির্ভরশীল জীবনযাপন করছেন।
ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মিজানুর জানান, সেদিন বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে গণভবনের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় থানার ছাদ থেকে বৃষ্টির মতো গুলি শুরু হয়। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে গাছের আড়ালে আশ্রয় নিলেও তিনি বুঝতে পারেন তার মুখমণ্ডল রক্তে ভেসে যাচ্ছে এবং তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। পরে দুই শিক্ষার্থীর সহায়তায় তিনি আলোক হাসপাতাল, দারুস সালাম গ্রিন ডেলটা হাসপাতাল এবং সবশেষে আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে সিএমএইচ, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউটে তার দুই চোখে মোট পাঁচটি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। মিজানুর জানান, তার ডান চোখে দৃষ্টি নেই এবং বাঁ চোখে মাত্র ২৩ থেকে ২৭ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি রয়েছে, তাও অত্যন্ত ঝাপসা। এখন প্রতি চার মাস অন্তর তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হয়।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানে ৮৬৫ জন শহীদ হয়েছেন এবং ১৫ হাজার ৯০৩ জন আহত হয়েছেন। সরকার আহতদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে। মিজানুর ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত আহত যোদ্ধা হিসেবে মাসে ২০ হাজার টাকা সরকারি ভাতা পাচ্ছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গাড়িচালক হিসেবে আগে যে আয় ছিল, ভাতার টাকা তার চেয়ে অনেক কম এবং চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া তার স্ত্রীও অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
বর্তমানে মিজানুর লালমনিরহাটের সদর উপজেলার হারাটি ইউনিয়নের ঢাকনাই কুড়ারপাড় গ্রামে মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে থাকেন। তার বাবা আলতাফ হোসেন জানান, ছেলের এই অবস্থা দেখে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। সরকারের অনুদান ও বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় পাওয়া ১১ লাখ টাকার বড় অংশ চিকিৎসা ও সংসার চালাতে গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। গরু ও সুপারিবাগান থেকে আয়ের চেষ্টা করলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি।
হাসপাতালে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার সময় এক ব্যক্তি তার মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেই চরম সংকটের মুহূর্তে তাকে উদ্ধারকারী দুই শিক্ষার্থীর কথা মনে করে আজও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মিজানুর। তিনি বলেন, ওই দুই শিক্ষার্থীকে তিনি আজও ভুলতে পারেননি এবং তাদের সঙ্গে একবার দেখা করার তীব্র ইচ্ছা পোষণ করেন।




