ফুটবলের চিরন্তন নিয়ম: এক প্রজন্মের বিদায় ও নতুনদের আগমন

প্রকাশ:

বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, বরং সময়ের এক নির্মম আয়না। সবুজ ঘাসের ওপর গড়িয়ে চলা বল কখন যে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনা করে, তা আগাম বলা কঠিন। চার বছর পরপর পৃথিবী যখন থমকে দাঁড়ায়, তখন গ্যালারির রঙিন পতাকা আর জাতীয় সংগীতের সুরের মাঝে বিদায় নিতে দেখা যায় অনেক মহাতারকাকে। দিয়েগো ম্যারাডোনা, জিনেদিন জিদান, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনিও, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি, ফিলিপ লাম, ওয়েইন রুনি কিংবা লুকা মদরিচদের মতো কিংবদন্তিরা এভাবেই ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন।

ফুটবলের মঞ্চ কখনোই শূন্য থাকে না। দুই দশক ধরে লিওনেল মেসির বাঁ পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছে পৃথিবী, আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো অদম্য পরিশ্রমের মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। বয়স তাদের গতি কমিয়ে দিলেও স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেনি। বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের কেভিন ডি ব্রুইনের মতো খেলোয়াড়রা বছরের পর বছর সৌন্দর্য উপহার দিলেও বিশ্বকাপের ট্রফি তাদের হাতে ওঠেনি। সময়ের নিয়মে একসময় রাজদণ্ড ছেড়ে দিতে হয়, আর তখন কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই শেষ বাঁশি বেজে জানান দেয় একটি যুগের সমাপ্তি।

তবে ফুটবলের শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী নয়। বিদায়ের সুরের পাশাপাশি জন্ম নেয় নতুন এক সিম্ফনি। লামিন ইয়ামালের মতো তরুণরা ভয়হীন চিত্তে মাঠে নামেন, যারা ইতিহাস অনুসরণ নয় বরং নতুন ইতিহাস গড়তে জানেন। কিলিয়ান এমবাপ্পের গতি ও দক্ষতা তাকে কিংবদন্তির পথে এগিয়ে নিচ্ছে, আর জুড বেলিংহ্যামের নেতৃত্বের পরিপক্বতা মধ্যমাঠে দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া আর্লিং হালান্ড গোল করাকে অভ্যাসে পরিণত করেছেন, যা নরওয়েকে দিয়েছে নতুন এক বিশ্বাস। উসমান দেম্বেলের সৃজনশীলতা আধুনিক ফুটবলের নতুন রূপক হয়ে উঠেছে।

১৯৫৮ সালে পেলের উদয় থেকে শুরু করে ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা, ১৯৯৮ সালে থিয়েরি অঁরি, ২০০৬ সালে জিদানের বিদায়, ২০১০ সালে স্পেনের টিকিটাকা, ২০১৪ সালে জার্মানির আধিপত্য, ২০১৮ সালে এমবাপ্পের আগমন এবং ২০২২ সালে মেসির অসমাপ্ত গল্প পূর্ণ হওয়া—ফুটবল সবসময়ই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। বর্তমানে গ্যালারিতে বসে থাকা শিশুটিও হয়তো ইয়ামালের জার্সি গায়ে চিৎকার করছে, ঠিক যেমন কয়েক বছর আগে তার বড় ভাই মেসির নাম লিখেছিল। সময় বদলায়, নায়ক বদলায়, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা অটুট থাকে। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে কেউ বিদায় নেন, আবার কেউ নতুন করে ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়েন।

শেয়ার করুন