হরমুজের অস্থিরতা যেভাবে পানামা খালে পরাশক্তির বিরোধ উসকে দিচ্ছে

প্রকাশ:

হরমুজ প্রণালীতে চলমান সঙ্ঘাত ও জাহাজ চলাচলের প্রতিবন্ধকতা বিশ্ব বাণিজ্যে গভীর সংকটের সৃষ্টি করেছে। এই সঙ্কটের রেশ এখন হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত পানামা খালেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা নৌপথের আধিপত্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক বিরোধকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা এই গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম নৌপথটি এখন বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, পানামা খালে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে বেইজিং এই দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনের ভাষ্যমতে, ওয়াশিংটন আসলে নৌপথটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অজুহাত হিসেবে এই ইস্যুটিকে ব্যবহার করছে। এদিকে, পানামা কর্তৃপক্ষ এই খালের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছে যে, খালটি স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষ থাকবে।

প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ পানামা খাল জাহাজগুলোকে দক্ষিণ আমেরিকার কেইপ হর্ন ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সমুদ্রযাত্রা থেকে মুক্তি দেয়। গাতুন হ্রদ ও লক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত এই খালের সক্ষমতা এখন পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার মুখে। এল নিনো ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গাতুন হ্রদের পানির স্তর কমে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ জাহাজের সংখ্যা সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন খাল পারাপারের অনুমতিপ্রাপ্ত জাহাজের সংখ্যা ৩৬ থেকে কমিয়ে ৩২ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই বিধিনিষেধ ২০২৩ সালের তীব্র খরার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যখন জাহাজের সংখ্যা সীমিত করায় দীর্ঘ জট তৈরি হয়েছিল এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়েছিল।

বিশ শতকের শুরুতে খালটি নির্মাণের পর যুক্তরাষ্ট্র এটি এবং আশপাশের ক্যানাল জোনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের আমলে আলোচনার মাধ্যমে সম্পাদিত ১৯৭৭ সালের তোরিহোস-কার্টার চুক্তি অনুযায়ী খালটির নিয়ন্ত্রণ পানামার কাছে হস্তান্তরের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর।

হরমুজ সঙ্কটের ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের রুটগুলোতে চাপের সৃষ্টি হয়েছে। বিমকো-এর তথ্যমতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী পাঁচ সপ্তাহে পানামা খাল দিয়ে ট্রানজিটের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ায় এশিয়ার ক্রেতারা যুক্তরাষ্ট্রের উপকূল থেকে তেল সংগ্রহ করছে, যা পানামা খালের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে বুকিংয়ের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক পারাপারের জন্য নিলামে মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় করার ঘটনা ঘটছে।

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক অরল্যান্ডো জে পেরেজ জানান, হরমুজ হলো জ্বালানি পরিবহনের কেন্দ্র, আর পানামা হলো বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সংযোগস্থল। পানামা খালের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ কনটেইনার পরিবহন করা হয়। খালটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ না থাকলেও, হংকংভিত্তিক সিকে হাচিসন এবং তাদের সহযোগী পানামা পোর্টস কোম্পানি কর্তৃক খাল-সংলগ্ন বালবোয়া ও ক্রিস্টোবাল বন্দর পরিচালনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। চলতি বছরের শুরুতে পানামার সুপ্রিম কোর্ট বন্দরের রেয়াত চুক্তিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়।

তবে ইউনিভার্সিটি অব চিলির অধ্যাপক হোর্হে হেইনে এই বিরোধকে অযৌক্তিক বলে মনে করেন। তিনি জানান, সিকে হাচিসন ১৯৯৭ সাল থেকেই সেখানে কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং তারা খাল পরিচালনা করে না, বরং বন্দর ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে। এদিকে, ২০২৫ সালের আগস্টে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বিতর্কে চীনের রাষ্ট্রদূত ফু চং বলেন, ‘চীনকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের মিথ্যা রটনা ও ভিত্তিহীন আক্রমণ খালটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার অজুহাত ছাড়া আর কিছু নয়।’

পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো বলেছেন, খালের নিরপেক্ষতাই সকল বৈশ্বিক হুমকির বিরুদ্ধে তাদের প্রধান প্রতিরক্ষা। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা পানামার সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চীনকে নিয়ে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

শেয়ার করুন