প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে দেশের শিল্পকারখানাগুলো চরম অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে, যার ফলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্য উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বাজার হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক কারখানায় দিন-রাতের অধিকাংশ সময় উৎপাদন চালু রাখতে হচ্ছে, যা একদিকে উৎপাদন ব্যয় ও চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ হারানোর আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
সাভার, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রমিকদের অভিযোগ, আট ঘণ্টা ডিউটির জন্য কর্মস্থলে এসে অনেককেই ১২ ঘণ্টার বেশি সময় অবস্থান করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কায় পরিচ্ছন্নতা ও কারখানা মেরামতের অজুহাতে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর রামপুরায় বসবাসকারী পোশাকশ্রমিক ফাতেমা জানান, সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কারখানায় থাকতে হয়। দিনের বেলা বিদ্যুতের অভাবে কাজ বন্ধ থাকলেও প্রোডাকশন টার্গেট পূরণের জন্য বাড়তি সময় দিতে হয়, যার জন্য বাড়তি টাকা দেওয়া হয় না। চাকরি হারানোর ভয়ে শ্রমিকরা এসবের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেন না।
বস্ত্র ও পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট মালিক সমিতির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের প্রয়োজনীয় সরবরাহ না থাকায় অধিকাংশ কারখানা ধুঁকে ধুঁকে চলছে। বারবার বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং জেনারেটর দিয়ে পুরো কারখানা একসঙ্গে চালানো যাচ্ছে না। এতে শ্রমিকদের অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর ডাইং ফ্যাক্টরিগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। কখনো কখনো সারা দিনে একবারও কাঙ্ক্ষিত গ্যাস না পাওয়ায় নষ্ট হচ্ছে কেমিক্যালমিশ্রিত লাখ লাখ মিটার কাপড়।
গাজীপুরের সাদামা ফ্যাশনওয়্যারের মহাব্যবস্থাপক মঈনুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে এক সপ্তাহ ধরে কাপড় ডাইং করা যাচ্ছে না। ডাইং কারখানায় ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট মাত্রায় গ্যাসের চাপ থাকতে হয়, যা বেশ কিছুদিন ধরে দিনরাত সব সময়ই ১ পিএসআইয়ের কম থাকছে। ফলে কারখানা চালিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তৈরি পোশাক উৎপাদনের কাপড় ১৫ দিন আগে ডাইং করতে হয়, কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে এক সপ্তাহ ধরে ডাইং ইউনিট চলছেই না। তিনি আরও জানান, গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে এবং এভাবে চলতে থাকলে ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে।
ভবানীপুরের মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানায় সুতা উৎপাদনের অধিকাংশ মেশিন বন্ধ রয়েছে। কয়েক দিন ধরে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ। সক্ষমতার ৩০ শতাংশ উৎপাদন করলেও উৎপাদন ব্যয় বেশি হয় এবং এই পরিমাণ উৎপাদন দিয়ে শ্রমিকের বেতন ও ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করে বেশি দিন টিকে থাকা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আমার দেশকে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ৩০-৩৫ শতাংশ কম হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন ও আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি চাপে পড়ায় পোশাক ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং অর্ডার কমে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, উৎপাদনব্যবস্থা ঠিক রাখতে তারা অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ব্যবহার করছেন। স্বাভাবিকভাবে ৯-১০ ঘণ্টা কাজ করলেও এখন ১২-১৩ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে, যা তাদের নন-কমপ্লায়েন্ট করে তুলছে এবং খরচও বাড়াচ্ছে। তবে অর্ডার বাতিল এড়াতে এটি করতেই হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ স্বাভাবিক সময়েই কম থাকে। সংকটের সময় সরবরাহ আরও নিচে নেমে যাওয়ায় শিল্প, বিদ্যুৎ, সার, সিএনজি ও আবাসিক খাতের মধ্যে গ্যাস বণ্টনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। গত কয়েক দিনে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ কিছু সময় ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে গিয়েছিল। পরে তা ২৪৪ কোটি ঘনফুটে উঠলেও আবার কমে ২১৮ কোটি ঘনফুটে নেমেছে, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। সংশ্লিষ্টরা জানান, সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে শিল্পকারখানায় সরবরাহ কমছে, যার ফলে উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে, কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ছে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
নরসিংদীর উদ্যোক্তারা জানান, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে সেখানকার কারখানাগুলোর অবস্থা খুবই ভয়াবহ। নরসিংদী সদর, মাধবদী, চৌয়ালা ও আশপাশের শিল্প এলাকায় গ্যাসনির্ভর শত শত কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ রেখেছে। কয়েকটি কারখানা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পুড়িয়ে বয়লার চালানোর চেষ্টা করছে, যা উৎপাদন সচল রাখলেও খরচ বাড়াচ্ছে। একটি কারখানায় প্রতিদিন কাঠের পেছনেই ১০ হাজার টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের হিসাবে, সাম্প্রতিক সংকটে নরসিংদীতে প্রতিদিন কয়েকশ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, কোথাও উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১০ শতাংশে। উদ্যোক্তারা বলছেন, কার্যত গ্যাস ছাড়া সাইজিং ও ডাইং কারখানা চালানো সম্ভব নয় এবং বিকল্প জ্বালানি দিয়ে উৎপাদন চালু রাখলেও তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মন্তব্য করেন, গ্যাস সংকট শিল্পের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাইং, নিটিং, ফিনিশিংসহ গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোয় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা সক্ষমতার তুলনায় অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে, কোথাও কোথাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খরচ বন্ধ থাকে না। তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তারা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন এবং পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ধরে রাখার সক্ষমতা হারাবে, ফলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়ে অনেক উদ্যোক্তা কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় প্রভাব পড়ছে। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যায়। আবার বিদ্যুৎ না থাকলে কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালাতে হয়, ফলে জ্বালানি খরচ বাড়ে। গ্যাস সংকট বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করছে আর বিদ্যুৎ সংকট শিল্পের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেলের ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়েছে। পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যের কারখানাগুলোয়ও বাড়তি জ্বালানি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে। এতে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে ঠিক এমন সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন। এতে উদ্যোক্তারা পড়েছেন ত্রিমুখী সংকটে: উৎপাদন বন্ধ বা কমে যাওয়ায় আয় কমছে, উৎপাদন না হলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে, এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
ফতুল্লা এলাকার একজন শিল্পমালিক জানান, গ্যাস সংকট শুরুর পর থেকেই তার কারখানা বন্ধ। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে চাকরি হারানোর ভয় সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিক্ষোভ-ভাঙচুরের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কায় তিনি নিজ কারখানায় পরিচ্ছন্নতা ও কারখানা মেরামতের কাজ করাচ্ছেন। ফতুল্লা ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং কারখানা ঘুরে দেখা যায়, মেশিনগুলো চলছে না, কোনো শ্রমিকও নেই, বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। নিরাপত্তাকর্মী ও কারখানা তদারকির দায়িত্বে থাকা কয়েকজন স্টাফ ছাড়া কেউ নেই। কর্মকর্তারা কারখানায় থাকলেও শ্রমিকরা হাজিরা দিয়েই চলে গেছেন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যানুযায়ী, দেশের ৫২টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১১ হাজার ৯৩৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসের অভাবে ২১টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ এবং আরও আটটি কেন্দ্র আংশিকভাবে চালু রয়েছে। এই ২৯টি কেন্দ্র পুরোপুরি সচল করা গেলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৬,৩১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করার সুযোগ ছিল। বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে চলতি আগস্টে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই গড়ে ২,০০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করছে সরকার। এমনকি ১০ আগস্ট মধ্যরাতের পর লোডশেডিং ৩,৭০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা সর্বকালের রেকর্ড।





