৩৬ বছরের বিশ্বকাপ রেকর্ড ভেঙে ইতিহাস গড়লেন উনাই সিমোন

প্রকাশ:

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের সহজ জয়ে স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমোন বিশ্বকাপ ফুটবলের এক পুরোনো ইতিহাস নতুন করে লিখলেন। ডিলান স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ওয়াল্টার জেঙ্গার ৩৬ বছরের পুরোনো গোল না খাওয়ার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন তিনি। ১৯৯০ বিশ্বকাপে জেঙ্গা টানা ৫১৭ মিনিট গোল না খাওয়ার যে রেকর্ড গড়েছিলেন, তা এখন স্প্যানিশ গোলরক্ষক সিমোনের দখলে।

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকেই সিমোন ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপজুড়ে ইকার ক্যাসিয়াসের গড়া ৪৭৬ মিনিটের স্প্যানিশ রেকর্ডটি ছাড়িয়ে যান। এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে কাঙ্ক্ষিত সেই মুহূর্তটি আসে, যখন তিনি জেঙ্গার বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে দেন। রেকর্ড ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই বড় পর্দায় ভেসে ওঠে, ‘বিশ্বকাপ রেকর্ড ভেঙে গেল!’ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের পর আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানান সিমোন, তবে সঙ্গে সঙ্গেই গ্লাভস দুটি চাপড়ে সতীর্থ ডিফেন্ডারদের পজিশন ঠিক রাখার তাগিদ দিতেও ভোলেননি। এই জয়ের মাধ্যমে স্পেন শেষ ১৬-তে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে।

চলতি বিশ্বকাপে সিমোনের গোল না খাওয়ার এই ধারা শুরু হয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকেই। কেপ ভার্দে (ম্যাচটি ০-০), সৌদি আরব (স্পেন ৪-০ গোলে জয়ী) এবং উরুগুয়ে (স্পেন ১-০ গোলে জয়ী)—এই তিন ম্যাচেই তিনি ক্লিন শিট রেখেছিলেন। টানা তিন ম্যাচে ক্লিন শিট রাখার পর তার নামের পাশে যোগ হয়েছিল ২৭০ মিনিট, যা সব মিলিয়ে ৪২৯ মিনিটে পৌঁছেছিল। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তিনি টানা চতুর্থ ক্লিন শিট অর্জন করেন। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সিমোনকে মাত্র চারটি সেভ করতে হয়েছে, যার মধ্যে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে কোনো দুর্ধর্ষ সেভ করার প্রয়োজনই পড়েনি।

ম্যাচ শেষে ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে আবেগ ঝরে পড়ে, “রেকর্ড ভাঙার জন্যই তৈরি হয়, কিন্তু উনাই (সিমোন) আজ যা করেছে, তা স্রেফ রেকর্ড নয়। এটি একাগ্রতা, আত্মত্যাগ আর ধৈর্যের এক পরম পরীক্ষা।” স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তও আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমি তাঁর জন্য গর্বিত। আমার মনে হয় সে আমার পরিবারেরই একজন সদস্য। সে জয়ে খুব বড় ভূমিকা পালন করেছে। তবে এটি শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্য নয়, এটি সেই রক্ষণাত্মক প্রচেষ্টার জন্য পুরো দলের একসঙ্গে একতাবদ্ধ হওয়া।”

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারে হেরে বুকভাঙা হতাশায় বিদায় নিয়েছিল স্পেন। সেই বিশ্বকাপে চার ম্যাচে মাত্র তিনটি গোল হজম করলেও ভাগ্যবিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল দল। জাপানের কাছে স্পেনের ২-১ ব্যবধানে হারের পর থেকে সিমোন শেষ ১৫৯ মিনিট স্পেনের জালে কোনো বল জড়াতে দেননি। কিন্তু দলের বিদায়ে তার সেই কীর্তি ঢাকা পড়ে গিয়েছিল বিষাদের কালো চাদরে।

প্রায় অর্ধদশক ধরে উনাই সিমোনই স্পেনের গোলরক্ষক হিসেবে প্রথম পছন্দ। ডেভিড রায়া ও জোয়ান গার্সিয়ার মতো ইউরোপের দুটি বড় লিগে শিরোপাজয়ী গোলরক্ষকদের সঙ্গে কড়া টক্কর দিয়ে ২৯ বছর বয়সী সিমোন নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। ক্লাব ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময় তিনি অ্যাথলেটিকো বিলবাও-এ কাটিয়েছেন, যারা গত মৌসুমে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

২০১৫ সাল থেকে দে লা ফুয়েন্তের কোচিং দীক্ষা পেয়েছেন সিমোন। ১৮ বছর বয়সে গ্রিসে ইউরোপীয় অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন তারা। স্পেনের যুব দলেও তারা একসঙ্গে লড়েছেন। ২০২২ সালে ফুয়েন্তে জাতীয় দলের ডাগআউটে আসার পর সিমোনকে অতন্দ্র প্রহরী রেখে ২০২৩ সালের নেশনস লিগ এবং ২০২৪ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের রাজমুকুট জিতেছে স্পেন। আর এখন তারা দীর্ঘ ১৬ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জিতেছে, যার অন্যতম নায়ক অবশ্যই উনাই সিমোন।

কিন্তু দল বিদায় নেওয়ায় তাঁর কীর্তি ঢাকা পড়ে যায় বিষাদের কালো চাদরে।.কে জানত, চার বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চেও দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হবেন সিমোন!

শেয়ার করুন