কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর ইউনিয়নের সৈয়দপুর বাজার এলাকা থেকে গত ১১ সেপ্টেম্বর রাতে আলম হাজারী নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি স্থানীয় একটি নাশকতা মামলার আসামি। অবাক করার মতো বিষয় হলো, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তিনি দেবিদ্বার উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি ছিলেন। সরকার পতনের পর তিনি বিএনপিতে যোগ দিলেও, তার বিরুদ্ধে আগের সরকারের আমলে গোপন অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনাটি বর্তমানে দলের ভেতর ‘বসন্তের কোকিল’ বনাম ‘ত্যাগী নেতা’ বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাজপথে আন্দোলন, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হওয়া বিএনপির প্রকৃত নেতা-কর্মীরা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে জেল-জুলুম সহ্য করা কর্মীরা যখন মূল্যায়নের অপেক্ষায় ছিলেন, ঠিক তখনই এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী নেতা দলের নিয়ন্ত্রণ ও সুযোগ-সুবিধা দখল করতে শুরু করেছেন। এদের অনেকেই গত ১৫ বছরে দলের কর্মসূচিতে অনুপস্থিত ছিলেন, এমনকি ক্ষমতাসীনদের সাথে আঁতাত করেও চলেছে। এখন টাকার জোরে বা ক্ষমতার দাপটে তারা প্রথম সারিতে চলে আসছেন, যা ত্যাগী কর্মীদের মধ্যে গভীর বঞ্চনা ও হতাশা তৈরি করেছে।
তৃণমূলের অভিযোগ, এই নব্য নেতাদের দখলদারি, চাঁদাবাজি ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড দলের ভাবমূর্তিকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আলম হাজারী ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রকৌশলী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর বাসায় আনুষ্ঠানিকভাবে দলে যোগ দেন। এমন ব্যক্তিদের দলে জায়গা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তৃণমূলের কর্মীরা বলছেন, নতুনদের আসার পথ বন্ধ না হলেও, দুঃসময়ে যারা দলের হাল ধরে রেখেছিল, তাদের অবমূল্যায়ন করা দলের দীর্ঘমেয়াদী শক্তির জন্য হুমকি। এই অসন্তোষ এখন আর ঘরোয়া আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ত্যাগী ঐক্য পরিষদ’ নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশের খবরও পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি গাজী সিরাজ এই বৈষম্য নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যারা গত ১৭ বছর ধরে হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের জায়গা কোথায়? ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে যদি নেতাদের সন্তান বা নব্যরা পদ-পদবি পায়, তবে ত্যাগী কর্মীদের ত্যাগের মূল্য কোথায় রইল? তার এই বক্তব্য দলের ভেতরে অনেকেরই মনের কথা। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের ত্যাগ অস্বীকার করার সুযোগ নেই এবং কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হবে। তবে তৃণমূলের কর্মীরা বলছেন, শুধু আশ্বাস নয়, বরং বিতর্কিতদের চিহ্নিত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জানিয়েছেন, সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায় সবাইকে প্রত্যাশিত পদ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে দলের হাইকমান্ড সবকিছু অবগত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে নতুন জনশক্তি ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের জায়গা দিতেই হয়, তবে এই ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে পুরনো কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখ নেতা-কর্মী মামলার শিকার হয়েছেন। এই বিশাল কর্মীবাহিনীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে না পারলে দলের আদর্শিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।





