পাঠ্যপুস্তক: রাজনৈতিক দলিল নয়, জাতি গঠনের এক শক্তিশালী নকশা

প্রকাশ:

একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় সেই জাতির শ্রেণিকক্ষের ভেতরে। পাঠ্যপুস্তক হলো শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে নীরব অথচ শক্তিশালী শিক্ষক। যদি পাঠ্যপুস্তক শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলে, তবে একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি তৈরি হয়। পক্ষান্তরে, পাঠ্যপুস্তকে যদি বৈষম্য, সংকীর্ণতা কিংবা অযৌক্তিক সামাজিক ধারণার প্রতিফলন ঘটে, তবে সেই নেতিবাচক প্রভাব সমাজকে দীর্ঘ সময় বহন করতে হয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শৈশবেই শিশুর আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি গড়ে ওঠে। বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের পাঠ্যবস্তু, শিক্ষক এবং পরিবার—এই তিনটি উৎসই শিশুদের আত্মবিশ্বাস গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখে। তাই পাঠ্যপুস্তক শুধু তথ্যের আধার নয়, এটি একটি মানসিক ও সামাজিক নির্মাণের উপকরণ।

আমাদের সমাজে আজও রান্না বা গৃহপরিচর্যাকে নারীর একক কাজ হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে, যা উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় 'লাইফ স্কিল' বা জীবনদক্ষতা হিসেবে গণ্য হয়। শিক্ষা যদি সমাজকে পরিবর্তন করতে না পারে, তবে তা কেবল পরীক্ষার খাতা পূরণের জন্যই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। আমাদের প্রধান সংকট পাঠ্যবইয়ে নয়, বরং এর প্রণয়ন পদ্ধতিতে। প্রায়ই দেখা যায়, বই ছাপানোর পর পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়। অথচ প্রশ্ন ওঠা উচিত, বই লেখার আগে কি পর্যাপ্ত গবেষণা হয়েছিল? নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞের মতামতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকে। ফলে মাঠপর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও গবেষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণ পর্যন্ত পৌঁছায় না। সচিবালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে তৈরি কারিকুলাম প্রত্যন্ত গ্রামের বিদ্যালয়ের বাস্তবতার সঙ্গে অনেক সময় খাপ খায় না। মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক কোনো অফিসকক্ষে নয়, বরং শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষণার সম্মিলিত অভিজ্ঞতায় তৈরি হওয়া উচিত।

বাংলাদেশে পাঠ্যক্রম তৈরির প্রক্রিয়াটি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শহর ও গ্রামের মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মতামত নেওয়া এবং শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, ভাষাবিজ্ঞানী ও কারিকুলাম গবেষকদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। খসড়া পাঠ্যক্রম তৈরির পর তা গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত করা উচিত, যাতে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরাও যুক্তিসংগত মতামত দিতে পারেন। নতুন কারিকুলাম চূড়ান্ত করার আগে অন্তত এক বছর পরীক্ষামূলকভাবে চালানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় অনলাইন কারিকুলাম ফিডব্যাক প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে, যেখানে নিবন্ধিত শিক্ষকরা সমস্যা ও সমাধানের প্রস্তাব জমা দেবেন, যা গবেষকরা বিশ্লেষণ করবেন।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের পথ দেখাতে পারে। সিঙ্গাপুর নতুন পাঠ্যক্রম চালুর আগে বহু বছর ধরে গবেষণা, পাইলটিং ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যেও কারিকুলাম সংশোধনের সময় ব্যাপক পরামর্শ ও জনমত গ্রহণের পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, শিক্ষাব্যবস্থার স্থায়িত্ব আসে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে, ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ থেকে নয়। সরকার বদলাতে পারে, রাজনৈতিক দর্শন পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু পাঠ্যপুস্তক যেন প্রতি কয়েক বছর অন্তর নতুন আদর্শের পরীক্ষাগারে পরিণত না হয়। শিক্ষার্থীর প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান ও নিরপেক্ষ ইতিহাস। শিক্ষা কোনো মন্ত্রণালয়ের একক সম্পদ নয়, বরং একটি জাতির সম্মিলিত বিবেক; আর সেই বিবেকের নির্ভরযোগ্য দলিল হওয়া উচিত আমাদের পাঠ্যপুস্তক।

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৫৫আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৫৬

শেয়ার করুন