ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে হাতে নেওয়া দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ছে। এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প দুটির শুরুতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বর্তমানে সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী এই ব্যয় বেড়ে ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এই বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। আজ পরিকল্পনা কমিশনে এই প্রকল্পের ওপর মূল্যায়ন বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং বিভিন্ন কারিগরি পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বাড়ছে। ২০১৯ সালে যখন প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়, তখন ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৫০ পয়সার কাছাকাছি। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২২ টাকায়। এর পাশাপাশি কর, ভ্যাট, ভূমি অধিগ্রহণ, সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর, পরামর্শক ব্যয়, নির্মাণকালীন সুদ এবং বিভিন্ন ধরনের আপৎকালীন ব্যয় নতুন প্রস্তাবে যুক্ত হয়েছে।
এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের আওতায় কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পাতালপথ এবং নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত উড়ালপথ মিলিয়ে ৩১ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ মেট্রোরেল ও ২১টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্পে ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকায় ঠেকেছে। বাড়তি ব্যয় অনুমোদন পেলে এই প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেলের পেছনে ব্যয় দাঁড়াবে ৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে সাভার থেকে গাবতলী, মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে তা বেড়ে প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অনুমোদন পেলে এ পথে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা।
উত্তরা-মতিঝিল পথে বর্তমানে মেট্রোরেল চলাচল করছে এবং এর সম্প্রসারিত অংশ কমলাপুর পর্যন্ত যাওয়ার কাজ চলছে। ২০১২ সালে নেওয়া এই পুরো পথে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা যায়, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয়েছে ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। ভারতও বিদেশি ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, কিন্তু ঋণে এমন কোনো শর্ত তারা মানে না যা ঠিকাদার নিয়োগের প্রতিযোগিতা ক্ষুণ্ন করে।
বাড়তি ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাইয়ে বিএনপি সরকারের আমলে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গত জুলাইয়ে কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয় এবং ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিকে যৌক্তিক বলে মত দেয়। অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, প্রতিবছর ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ডলারের মান ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি এবং নকশায় পরিবর্তনের ফলে কাজের পরিধি বাড়ায় ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে। তিনি মনে করেন, সময় যত গড়াবে, প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়বে। ব্যয় বেশি মনে হলে সরকার অন্য ঋণদাতা খুঁজতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। তিনি বলেন, দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা না থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো চড়া দাম হাঁকানোর সুযোগ পাচ্ছে। জাপানি সংস্থা জাইকার ঋণ শর্তের কারণে এবং দরপত্র দলিলে কাজের এমন পদ্ধতি ও প্রযুক্তির কথা অন্তর্ভুক্ত করায় জাপানি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের অংশগ্রহণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি ঋণদাতা সংস্থাকে বুঝিয়ে শর্ত শিথিল করতে পারে এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে, তবে ব্যয় এমনিতেই কমে যাবে।
সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, শুরুর দিকে পূর্ণাঙ্গ নকশা না থাকায় ব্যয় প্রাক্কলন কম ছিল। বর্তমানে নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর বাস্তবতা অনুযায়ী ব্যয় বেড়েছে। মন্ত্রী বলেন, ঢাকা শহরকে টিকিয়ে রাখতে মেট্রোরেল অপরিহার্য এবং এখন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন না করলে ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়বে। উল্লেখ্য, ঢাকা মহানগরীতে ৮টি মেট্রোরেল, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে ও ২১টি পরিবহন হাবের পরিকল্পনা রয়েছে।





