বাংলাদেশে মাদক সংক্রান্ত অসংখ্য মামলা নিয়মিত আদালতে ওঠে। তবে কেবল "মাদক উদ্ধার হয়েছে" দাবি করলেই আসামি দোষী সাব্যস্ত হন না। ফৌজদারি আইনের চিরন্তন নীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপক্ষকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে যে আসামিই অপরাধটি করেছেন। ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়া মডেল থানা এলাকায় পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুই ব্যক্তিকে আটক করে এবং তাদের কাছ থেকে মোট ২০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগ আনে। এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ৮ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করলেও, তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ঘাটতির কারণে মামলাটি শেষ পর্যন্ত আদালতে টেকেনি।
এই মামলার আইনি দুর্বলতার অন্যতম কারণ হলো ঘটনাস্থলের নির্বাচন। জনবহুল ও ব্যস্ত এলাকায় অভিযান চালানো হলেও ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী স্থানীয় অন্তত দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখা হয়নি। অধিকাংশ সাক্ষীই ছিলেন অভিযানকারী পুলিশ দলের সদস্য, যারা মামলার ফলাফলে স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধু পুলিশ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেওয়া নিরাপদ নয়। এছাড়া উদ্ধারকৃত ইয়াবা সিলগালা করে মালখানায় জমা দেওয়া এবং রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো আলামতের সাথে জব্দ তালিকার মিল থাকার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো স্পষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি, যা আলামত পরিবর্তনের (Tampering) আশঙ্কা তৈরি করে।
তদন্ত প্রক্রিয়ায়ও ছিল বড় ধরনের ত্রুটি। "গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান" চালানোর ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, ফলে তথ্যের উৎস যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না। মামলার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল পাবলিক সাক্ষীদের ভূমিকা; তারা আদালতে এসে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য সমর্থন করেননি এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার বিষয়টিও অস্বীকার করেছেন। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত (২০ বিএলডি ৪২৬; ৫ বিএলসি ৫১৪) অনুযায়ী, পাবলিক সাক্ষী প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য না দিলে পুলিশ সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায় না। এছাড়া মামলার বাদী দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করায় তিনি নিজে আলামত শনাক্ত করতে পারেননি, যা রাষ্ট্রপক্ষের মামলাকে আরও দুর্বল করে দেয়।
সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও অসঙ্গতি দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরা তদন্তের সময় (ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী) যেসব কথা বলেননি, আদালতে এসে নতুন করে সেই তথ্যগুলো বলায় সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ৩৯(২) ধারা অনুযায়ী মাদক মামলার তদন্তের ক্ষমতা মূলত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অধীনস্থ কর্মকর্তার। পুলিশ বা র্যাবের কোনো কর্মকর্তা, যিনি ওই অধিদপ্তরের অধীনস্থ নন, তার তদন্ত পরিচালনার এখতিয়ার নিয়েও আইনি প্রশ্ন (১৪ বিএলসি ৬৭৭) থেকে যায়।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের নীতি অনুযায়ী, দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে নির্দোষ ধরে নিতে হবে (৪২ ডিএলআর ৩১)। ফৌজদারি বিচারে আবেগ বা অনুভূতির কোনো স্থান নেই। যখন মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণে এত বেশি অসঙ্গতি ও ঘাটতি থাকে যে গোটা মামলাটিই সন্দেহজনক হয়ে ওঠে, তখন সেই সন্দেহের সুবিধা আসামির প্রাপ্য অধিকার—এটি কোনো করুণা নয়। নিরপেক্ষ সাক্ষী না থাকা, আলামতের হেফাজতে সন্দেহ এবং সাক্ষ্যের পরস্পরবিরোধিতা প্রমাণ করে যে, কেবল মাদক উদ্ধারই যথেষ্ট নয়; আইনের সঠিক প্রয়োগ ও স্বচ্ছ তদন্তই ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি।
আদালত বলেছেন — সাক্ষীরা হলেন ন্যায়বিচারের চোখ ও কান; গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের পরীক্ষা না করানো হলে মামলার সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে (৫৭ ডিএলআর (এইচসি) ৫১৩)।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও পিএইচ.ডি-ইন-ল যোগাযোগ: ০১৭১৬৮৫৬৭২৮ | ইমেইল: seraj.pramanik@gmail.com





